প্রত্যেক মার্কেটারের জানা উচিত এমন সাতটি সাইকোলজিক্যাল থিওরী

মার্কেটিং হচ্ছে যেকোনো ব্যবসার প্রাণ। মার্কেটিং ছাড়া কোনো ব্যবসাতেই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয় না। কারণ মার্কেটিং করার মানে আপনার ব্যবসার প্রচার করা। আর ব্যবসার প্রচার মানে ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করা। যত বেশি প্রচার করা হবে, তত বেশি ও তত ভালোভাবে ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হবে। আর ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করা মানে বিক্রি বৃদ্ধি পাওয়া। যার ফলে আয় বৃদ্ধি পাওয়া ও সর্বোপরি ব্যবসায় সাফল্য অর্জন করা। 

মার্কেটিং সাইকোলজি জানা খুবই জরুরী; Source: heworthgrange.org

মার্কেটিংয়ের অনেক মেথড রয়েছে। যদিও মার্কেটিং শব্দটা ততটা ভারী নয় কিন্তু মার্কেটিং করে ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষন করাটাও ততটা সহজ নয়। আর যাতে ভালোভাবে ক্রেতাকে আপনার পণ্য বিক্রি করতে পারেন ও বেশি সংখ্যক ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন, সেজন্য দরকার হচ্ছে ‘ক্রেতা সম্পর্কে জ্ঞান’। একজন মার্কেটার তার ক্রেতা সম্পর্কে যত বেশি জানবেন তত সহজে তিনি একটা পণ্য বিক্রি করতে পারবেন ও ক্রেতার সাথে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করতে পারবেন।

সাইকোলজি আপনাকে চিন্তা করার ধারণা সম্পর্কে বলবে; Source: colourbox.com

আপনি কি এমন কোনো পণ্য বা সার্ভিস তৈরি করেছেন যেটা খুব সহজেই মার্কেট দখল করে নেবে? কিন্তু ঠিকভাবে মার্কেটিং সম্পর্কে বুঝতে পারছেন না? কোন ধরণের ক্রেতার কাছে আপনার পন্য পৌঁছে দেবেন এবং ক্রেতা কিভাবে বাছাই করবেন সে সম্পর্কে কোনো ধারণা পাচ্ছেন না? চলুন জেনে নেওয়া যাক এমন কিছু সাইকোলজিক্যাল থিওরি সম্পর্কে, যেগুলো দ্বারা একজন মার্কেটার হিসেবে আপনি অতি সহজেই ব্যবসার সফলতার দিকে এগিয়ে যেতে পারবেন।

সাইকোলজিক্যাল থিওরীগুলো মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে খুবই জরুরী; Source: colourbox.com

ডিকোয় এফেক্ট (Decoy Effect)

ধরুণ আপনি সিনেমা হলে পপকর্ন কিনবেন। এখন আপনার সামনে দু ধরনের পপকর্ন রয়েছে। ছোটো প্যাকেটের দাম ১২০ টাকা এবং বড় প্যাকেটের দাম ২৫০ টাকা। আপনি কোনটা বাছাই করবেন? ছোটোটাই বাছাই করবেন, তাই না? কারণ, বড়টার দাম একটু বেশি বলেই মনে হচ্ছে।  এখন মার্কেটাররা যেটা করবে। তারা ছোটো প্যাকেট আর বড় প্যাকেটের মাঝখানে আরেকটি মাঝারি আকারে প্যাকেট বানিয়ে সেটার দাম ২২০ টাকা রেখে বিক্রি করে দেবে। এখন ক্রেতাদের যদি তিনটি প্যাকেটই দেখানো হয় তখন বেশিরভাগ ক্রেতাই তৃতীয় প্যাকেটটি অর্থাৎ ২৫০ টাকা দামের প্যাকেটটি ক্রয় করবে। 

ডিকোয় এফেক্টে অপশন থাকে অসম; Source: phys.org

এই পদ্ধতিকেই বলে ডিকোয় এফেক্ট। ডিকোয় এফেক্ট হচ্ছে এমন একটি সাইকোলজিক্যাল মেথড যেখানে, বিক্রেতা অথবা মার্কেটার আপনাকে যদি অসামঞ্জস্য তিনটি অপশন দিয়ে থাকে তাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপনি যেটার দাম বেশি সেটা বাছাই করবেন। এর কারণ হচ্ছে, আপনার সামনে যখন দুটো অপশন ছিলো, ছোটো ও বড়; তখন আপনি দামের দিকে খেয়াল করে দেখলেন যে, বড়টার দাম অনেক বেশি। আর সেজন্য বড় প্যাকেটটাকে আপনি উপেক্ষা করলেন। 

এই সাইকোলজিক্যাল থিওরি অনেক বেশি প্রচলিত; Source: gsb.stanford.edu

কিন্তু যখন আপনার সামনে তিনটি অপশন রাখা হলো, তখন আপনার কাছে মাঝারি আকারের প্যাকেট থেকে বড় আকারের প্যাকেটের দাম বেশি বলে মনে হয়নি। মাত্র ৩০ টাকা (২৫০-২২০=৩০) বেশি দেখে আপনি ভাববেন আপনি লাভ করছেন, সেদিকে খেয়াল করে আপনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বড় প্যাকেটের দিকে ঝুঁকবেন।

ফ্রেমিং এফেক্ট (Framing Effect)

ধরা যাক, আপনি দোকানে গেলেন জুস কেনার জন্য। প্রথম জুসের প্যাকেটে লেখা দেখলেন, ‘৯০ শতাংশ সুগার ফ্রি!’ আর দ্বিতীয় জুসের প্যাকেটে লেখা দেখলেন, ‘মাত্র ১০ শতাংশ সুগার রয়েছে এতে!’ আপনি কোনটা বাছাই করবেন? স্বাভাবিকভাবেই আপনি প্রথমটি কেনায় আগ্রহ প্রকাশ করবেন। এর কারণ হচ্ছে, ‘সুগার ফ্রি’ শব্দটা ‘সুগার রয়েছে’ শব্দের থেকে বেশি আকর্ষণ করে। 

ফ্রেমিং এফেক্টের মাধ্যমে ক্রেতাদের সহজেই আকৃষ্ট করা যায়; Source: empower-retirement.com

যদিও উপরের দুটো প্যাকেটেই একই পরিমাণ সুগার রয়েছে এবং দুটো প্যাকেটের কথাই সমান। কিন্তু আমরা ‘বড় কোনো সংখ্যা’ এবং যেটার মধ্যে ‘বিনামূল্য’ শব্দদুটো লেখা থাকে সেগুলোর দিকে সহজে আকর্ষিত হই। আর এটাই হচ্ছে ফ্রেমিং এফেক্ট।

ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার থিওরি (The Theory of Reciprocity)

মনে করুন, একটি রেস্টুরেন্টের খাবারের মেন্যুতে প্রায় বিশ ধরণের খাবার রয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র পনের ধরনের খাবারই বেশ ভালো চলছে আর বাকি পাঁচ ধরণের খাবার ততটা বিক্রি হচ্ছে না। বেশ কিছুদিন এভাবে চলার পর রেস্টুরেন্টের মালিক একটা ঘোষণা দিলেন। তিনি বললেন, “যদি কেউ এই পাঁচ ধরণের খাবার থেকে যেকোনো দুটো খাবার একটানা দশদিন খায় তাহলে তাকে বিনামূল্যে বাকি তিন ধরনের খাবার প্যাকেট করে দেয়া হবে।” 

ক্রেতারা দিতে ও নিতে পছন্দ করে; Source: waterlanddreams.com

এই ঘোষণার পর হঠাত করেই সেই রেস্টুরেন্টের ঐ পাঁচ ধরণের খাবারের চাহিদা বাড়তে শুরু করলো। একসময় ক্রেতারা সেই পাঁচ ধরনের খাবারই বেশি খেতে শুরু করলো। এই ধরণের সাইকোলজিক্যাল পদ্ধতিকে বলে ‘ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার থিওরি।’ ক্রেতারা শুধু অর্থ দিয়ে খাবার ক্রয় করতেই পছন্দ করে না, বরঞ্চ প্রত্যেকেই কিছু না কিছু ছাড় কিংবা সুবিধা পেতেও পছন্দ করে। 

কাস্টোমারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেয়া

একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে নতুন কিছু সার্ভিস যুক্ত হলো। সেই সার্ভিসগুলোর দাম একটু বেশিই ছিলো। তারা বেশ ভালোভাবে মার্কেটিং করে তাদের ক্রেতাদের বললো, “যদি কেউ এই সার্ভিসগুলো ক্রয় করে থাকে তাহলে তারা প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাবে।” তারপরে একমাস পরে দেখা গেলো যে, যতটা পরিমাণ বিক্রি হওয়ার কথা ছিলো ততটা বিক্রি হয়নি। 

ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দিন; Source: corelogic.com.au

অতঃপর তারা একই সার্ভিস দিয়ে তাদের ক্রেতাদের বললো, “যদি কেউ এই সার্ভিসগুলো ক্রয় করে থাকে তাহলে তারা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাবে। একইসাথে তারা যদি চায় তাহলে একমাস বিনামূল্যে ব্যবহার করে সেই সার্ভিসগুলো ক্যান্সেল করে দিতে পারে।” শুধুমাত্র এই শেষ লাইনটি যুক্ত করার ফলেই দেখা গেলো যে, সার্ভিসগুলোর বিক্রি আগেরবারের চেয়ে প্রায় কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ ক্রেতা ধরে রাখতে সাহায্য করে; Source: aminian.com

এর মানে হচ্ছে, আপনার ক্রেতাকে জোর করে কিছু খাইয়ে দিতে হলেও তার মতামতের দিকে আপনার নজর রাখা উচিত। আপনি যতই ছাড় দিয়ে থাকেন না কেন, যদি আপনার সার্ভিস বা পণ্যের কোয়ালিটির উপর আপনার বিশ্বাস না থেকে থাকে তাহলে এই মেথড কাজ করবে না। যদি আপনার পণ্যের মান ভালো হয়ে থাকে, তাহলে দেরিতে হলেও ক্রেতা আপনার কাছে ফিরে আসবেই।

পরিচিত ব্র্যান্ডের কারণে আপনার ভ্যালুও বাড়বে; Source: applicoinc.com

ফ্যামিলিয়ার ফেইস এফেক্ট (Familiar Face Effect)

মানুষ যতই সামনের দিকে এগুতে থাকুক না কেন কিংবা যতই নিত্যনতুন ব্র্যান্ডের বা কোম্পানির আবিষ্কার হোক না কেন; মানুষ এখনো পুরনো ব্র্যান্ডগুলোর দিকেই ঝুঁকে আছে। আর এটাই হচ্ছে ফ্যামিলিয়ার ফেইস এফেক্ট। আপনার কোনো পণ্যের বা সার্ভিসের সাথে যদি পরিচিত ও স্বনামধন্য কোন ব্র্যান্ডের সংযোজন করা যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আপনার সার্ভিস বা পণ্যের সফলতা খুব শীঘ্রই দেখা দেবে।

Featured Image: musicisaweapon.org

The post প্রত্যেক মার্কেটারের জানা উচিত এমন সাতটি সাইকোলজিক্যাল থিওরী appeared first on Youth Carnival.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *